ভৈরব প্রতিনিধিঃ
সাফল্যের মুকুট মাথায় উঠেছে শিক্ষার্থীদের,কিন্তু সেই আনন্দের মুহূর্তে পাশে থাকার কথা যাদের,সেই অভিভাবকদের মাঝেও দেখা গেছে প্রফুল্ল,আবেগঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে অনুষ্ঠিত হয়েছে কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা-২০২৬।
বৃহস্পতিবার(৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬)সকাল ১১টায় উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কমলপুর হাজী জহির উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এসএসসি-২০২৬ ও জুনিয়র বৃত্তি-২০২৫ পরীক্ষায় সাফল্য অর্জনকারী মোট ৩৭ জন কৃতি শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা ও আর্থিক পুরস্কার প্রদান করা হয়।
২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির ২২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। তাদের মধ্যে ৫ জন গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালের জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় ১৫ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি লাভ করেছে,যার মধ্যে ৮ জন ট্যালেন্টপুল এবং ৭ জন সাধারণ বৃত্তি অর্জন করেছে। পুরো ভৈরব উপজেলার এসএসসি-২০২৬ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী জান্নাতুল রাইছা হাসান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভৈরব উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার কামাল উদ্দিন। বিশেষ অতিথি ছিলেন আজীবন দাতা সদস্য ও যুবসমাজের আইকন মাসুদুর রহমান জিসান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বের দায়িত্বে ছিলেন উক্ত বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির(এডহক)সভাপতি মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন অধ্যক্ষ(ভারপ্রাপ্ত)মো.আজিজুল হক।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন অত্র বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আহসান উল্লাহ আকাশ। পাশাপাশি নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাদিয়া হক ঐশী ও ফাবিয়া ইসলাম আরিয়া সঞ্চালনায় সহযোগিতা করেন।
বিশেষ অতিথি মাসুদুর রহমান জিসান তিনি কৃতি শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন,মঞ্চে পুরস্কার গ্রহণের সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের অভিভাবকদেরও ফটোসেশনে অংশ নেওয়া উচিত। যারা এবার ভালো ফলাফল করেছে, তাদের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে আগামী বছর আরও বড় সাফল্য অর্জনের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে যারা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল করতে পারেনি, তাদের আরও মনোযোগী হয়ে পড়াশোনা করার পরামর্শ দেন।
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শাফায়েত হোসেন বলেন,২০২৫ সালের জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় সাফল্য এবং এসএসসি-২০২৬-এ ২২ জনের জিপিএ-৫ অর্জন প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।অনুষ্ঠানে প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থীর উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বলেন,এক পাশে শিক্ষার্থী আর অন্য পাশে অভিভাবকদের উপস্থিতি থাকলে দৃশ্যটি আরও সুন্দর হতো। সন্তানের অর্জনের দিনে বাবা-মায়ের হাসিমুখ শিক্ষার্থীদের আরও অনুপ্রাণিত করে,শিক্ষকরাও আনন্দিত ও প্রফুল্ল হন।
তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “সার্টিফিকেট জীবনের একটি অংশ, কিন্তু ভালো মানুষ হওয়াই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। সার্টিফিকেটের পাশাপাশি মৌলিক অধিকার, নৈতিকতা, শিষ্টাচার ও মানবিক মূল্যবোধ অর্জন করতে হবে।”
প্রধান অতিথির বক্তব্যেও উঠে আসে অভিভাবকদের দায়িত্বশীলতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি। তিনি সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে বলেন, মাদকাসক্ত সন্তানের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এক বৃদ্ধ মা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে ছেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু আইনগত প্রক্রিয়ার কারণে অভিযোগ ও মামলা ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। সন্তানের এমন পরিণতির পেছনে পরিবার ও অভিভাবকদের ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, সন্তান বেড়ে ওঠার সময় তাকে যথাযথ ভালোবাসা,সময়, শাসন ও সু-শিক্ষা দেওয়া হলে ভবিষ্যতে অনেক পরিবারকে সন্তানের কারণে হতাশা ও নির্যাতনের শিকার হতে হতো না। অনুষ্ঠানে কৃতি শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের তুলনামূলক কম উপস্থিতি নিয়েও তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে একটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচনায় আসে,কৃতি শিক্ষার্থীদের অনেকেই শিক্ষক-শিক্ষিকার সন্তান। উপস্থিত অভিভাবকদের বড় অংশও ছিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা। ফলে অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত অভিভাবকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো কম।বক্তারা মনে করেন,সন্তানের সাফল্যের দিনে অভিভাবকের উপস্থিতি শুধু একটি ছবি নয়,এটি সন্তানের প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও মানসিক সমর্থনের প্রতীক।অভিভাবকদের এমন অনুপস্থিতি যদি নিয়মিত হয়ে ওঠে, তবে সন্তানদের সঙ্গে পরিবারে দূরত্ব বাড়তে পারে। আর সেই সুযোগেই সমাজে কিশোর গ্যাং,মাদকাসক্তি ও নানা অপরাধের বিস্তার ঘটতে পারে,এমন আশঙ্কাও ব্যক্ত করেন তারা।
অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত ও সুশৃঙ্খল রাখতে অতিথি, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের আন্তরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বিদ্যালয়ের দুই সহকারী শিক্ষক জামাল উদ্দিন ও মনির হোসেন।সবশেষে কৃতি শিক্ষার্থীদের হাতে ক্রেস্ট ও আর্থিক পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। আনন্দের এ আয়োজনে সাফল্যের হাসি যেমন ছিল,তেমনি ছিল একটি নীরব প্রশ্নও,সন্তানের বিজয়ের মঞ্চে যদি বাবা-মায়ের আসনটি খালি থাকে,তবে সেই বিজয়ের আনন্দ কি সত্যিই পূর্ণতা পায়?শিক্ষার্থীর অর্জন শুধু তার একার নয়;এর পেছনে থাকে শিক্ষক,পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত অবদান। তাই ভবিষ্যতে এমন আয়োজনগুলোতে কৃতি শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদের উপস্থিতিও নিশ্চিত করা গেলে সাফল্যের এই উৎসব আরও প্রাণবন্ত, অনুপ্রেরণাময় ও অর্থবহ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।